• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২ মার্চ, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১২ মার্চ, ২০২৬
Designed by Nagorikit.com

চৌদ্দগ্রামে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে মাদক!ছুপুয়া থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত ২৫ স্পটে সক্রিয় মাদক সিন্ডিকেট

কুমিল্লা জার্নাল
[sharethis-inline-buttons]
Oplus_131072

নিজস্ব প্রতিবাদ

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সরেজমিন অনুসন্ধানে। মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাক থামিয়ে মাদক বিক্রি, ট্রাক হোটেলের আড়ালে মাদক বেচাকেনা এবং রাত নামলেই সক্রিয় হয়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট—সব মিলিয়ে এলাকায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সরজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, চৌদ্দগ্রামের ছুপুয়া রাস্তার মাথা থেকে শুরু করে চৌদ্দগ্রাম বাজার পর্যন্ত দীর্ঘ মহাসড়কজুড়ে অন্তত ২৫টি স্পটে নিয়মিতভাবে মাদক বেচাকেনা চলছে। দিনের বেলায় এসব স্থান তুলনামূলক শান্ত থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বেড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই মহাসড়কের পাশে কিছু নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হতে থাকে মাদক বিক্রেতারা। তারা অনেক সময় টর্চলাইট দিয়ে সিগন্যাল দিয়ে ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন থামায়। এরপর সুযোগ বুঝে ট্রাকচালক ও হেলপারদের কাছে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য বিক্রি করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে চললেও রহস্যজনক কারণে অনেক সময় দৃশ্যমানভাবে কঠোর কোনো অভিযান দেখা যায় না। ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

ট্রাক হোটেলের আড়ালে রমরমা মাদক ব্যবসা
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা অনেক ট্রাক হোটেল মূলত মাদক ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এসব হোটেলে ট্রাক চালকরা খাবার ও বিশ্রামের জন্য থামলেও অনেক জায়গায় গোপনে মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কিছু হোটেলে আলাদা করে মাদক মজুদ রাখা হয়। ক্রেতা এলে হোটেলের কর্মচারী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গোপনে তা সরবরাহ করে। বিশেষ করে দূরপাল্লার ট্রাক চালক ও তাদের সহকারীরাই এসব মাদকের প্রধান ক্রেতা বলে জানা গেছে।

মহাসড়কের পাশে থাকা দোকানদার ও স্থানীয়দের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাতে এসব হোটেল এলাকায় অচেনা মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। অনেক সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি মাদক বিক্রির ঘটনাও দেখা যায়।

সরজমিন অনুসন্ধানের সময় সৈয়দপুর রাস্তার মাথায় সিটি ব্রিকসের পাশে অবস্থিত ‘আব্দুল্লাহ ট্রাক হোটেল’ এলাকায় মাদক বিক্রির সময় দুই ব্যক্তিকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন উপস্থিত সাংবাদিকরা। ধরা পড়া ওই দুই ব্যক্তি নিজেদের ওই হোটেলের মালিক বলে পরিচয় দেন। সাংবাদিকদের কাছে তারা দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা সেখানে মাদক বিক্রি করছেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, প্রতিমাসে চৌদ্দগ্রাম থানা ও মিয়াবাজার হাইওয়ে থানার কিছু পুলিশ সদস্যকে নিয়মিত মাসোহারা দেওয়ার কারণেই তারা নির্বিঘ্নে এই ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছেন। তবে তাদের এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার সময় উপস্থিত সাংবাদিকরা তাদের আটকে রেখে পুলিশকে জানানোর চেষ্টা করেন। তবে কিছুক্ষণ পর সুযোগ বুঝে ওই দুই ব্যক্তি সেখান থেকে পালিয়ে যায় বলে জানা গেছে।এ সময় মিয়াবাজার হাইওয়ে পুলিশের একটি টহল গাড়ি ঘটনাস্থলের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। উপস্থিত সাংবাদিকরা গাড়িটিকে সিগন্যাল দিয়ে থামানোর চেষ্টা করলেও সেটি না থেমেই চলে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হলেও কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, শুধু একটি জায়গা নয়—ছুপুয়া থেকে চৌদ্দগ্রাম বাজার পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। অনেক জায়গায় ছোট ছোট দোকান, হোটেল কিংবা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মাদক বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এসব স্থানে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের সঙ্গে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হলেও কিছুদিন পর আবার আগের মতো মাদক বিক্রি শুরু হয়ে যায়। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, মহাসড়কের পাশে এত সহজে মাদক পাওয়া গেলে তরুণ সমাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক যুবক এই মাদকাসক্তির কারণে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একজন স্থানীয় শিক্ষক বলেন, “মহাসড়কের পাশে যদি এভাবে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়, তাহলে তরুণদের রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিয়াবাজার হাইওয়ে থানার ওসি শাহাবুদ্দিন বলেন,
“আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। আমাদের কোনো সদস্য যদি এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় সচেতন মহল ও এলাকাবাসীর দাবি, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়। দ্রুত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, নিয়মিত অভিযান, কঠোর নজরদারি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

এলাকাবাসী মনে করেন, প্রশাসন যদি আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেয়, তাহলে মহাসড়ক কেন্দ্রিক এই মাদক ব্যবসা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

[sharethis-inline-buttons]

আরও পড়ুন

  • লিড এর আরও খবর