বিশেষ প্রতিনিধি ::
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা শিল্পায়নের ওপর নির্ভর করে না। দেশের মানুষের কর্মক্ষমতা, সামাজিক নিরাপত্তা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং তরুণ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশও টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। এসব ক্ষেত্রকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত করছে মাদকের বিস্তার। মাদকাসক্তি ব্যক্তির জীবন ধ্বংস করার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের এই অবস্থান যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, অর্থনৈতিক ক্ষতি হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বাংলাদেশকে মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে পারলে উন্নয়নের পথে অগ্রযাত্রা আরও গতিশীল হবে।
মাদক ও ধূমপানের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিবছর ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হচ্ছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবের উল্লেখ করা হয়েছে। মাদকের কারণে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের অসুস্থতা বাড়ছে, কমছে কর্মক্ষমতা। বিপুলসংখ্যক মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে স্বাভাবিক কর্মজীবন থেকে ছিটকে পড়ছেন। এতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় উৎপাদনশীলতাও ব্যাহত হচ্ছে। অর্থাৎ মাদক কেবল স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিরও বড় প্রতিবন্ধক।
অন্যদিকে অপরাধ বৃদ্ধির পেছনেও মাদকের বড় ভূমিকা রয়েছে। মাদকাসক্তি থেকে অর্থের প্রয়োজন তৈরি হয়, সেই প্রয়োজন মেটাতে অনেকে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। এর প্রভাব পড়ে সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাদকের বিস্তার তরুণ সমাজের সম্ভাবনা নষ্ট করছে। যে তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের চালিকাশক্তি হওয়ার কথা, তাদের একটি অংশ মাদকের কারণে বিপথগামী হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ মাদককে অপরাধের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর বক্তব্যের মূল দর্শন ছিল, মাদকের বিস্তার রোধ করতে না পারলে নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা কঠিন।
সিঙ্গাপুরে মাদক নিয়ন্ত্রণে তাঁর সরকারের কঠোর নীতির প্রতিফলন ঘটে ১৯৭৩ সালে প্রণীত ‘মিসইউস অব ড্রাগস অ্যাক্ট’-এ। এই আইনে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মাদক রাখা ও পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়। আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনা সত্ত্বেও লি কুয়ান ইউ আইনটিকে দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে সমর্থন করেন। দেশটির সেন্ট্রাল নারকোটিকস ব্যুরোকে মাদকবিরোধী অভিযান, তল্লাশি ও নজরদারির ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। কঠোর আইন প্রয়োগ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফলে সিঙ্গাপুর মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় এই নীতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সিঙ্গাপুরের মতো আরও কয়েকটি দেশ মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান অনুসরণ করছে। মালয়েশিয়ায় নির্দিষ্ট ধরনের মাদক পাচারের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। মাদক রাখা ও সেবনের ক্ষেত্রেও কারাদণ্ড এবং জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। বিদেশি নাগরিকদের মাদকসহ আটক করা হলে তাদের বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। থাইল্যান্ডেও মাদক পাচারের গুরুতর অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। সৌদি আরবে মাদক পাচারের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। কুয়েত ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও মাদকসংক্রান্ত অপরাধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। ইন্দোনেশিয়াতেও মাদক পাচারের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘদিন ধরে মাদক নিয়ন্ত্রণকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে দেশের অন্যতম প্রধান শত্রু ঘোষণা করে এর বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে এটি ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ বা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে পরিচিতি পায়। মাদক উৎপাদন, পাচার ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং নাগরিকদের নিরাপদ রাখা ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী নীতি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত হয়। তবে দেশটির এই নীতির কার্যকারিতা ও মানবাধিকারসংক্রান্ত নানা দিক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের মাদকবিরোধী অভিযানও বিশ্বজুড়ে আলোচিত ও সমালোচিত। দাভাও সিটির মেয়র থাকাকালে তিনি মাদক ও অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তাঁর এই নীতি অব্যাহত থাকে। ২০২২ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনামলে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানে বহু মানুষ নিহত হন। এসব হত্যাকাণ্ডের বৈধতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। ২০২৫ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কাছে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি ওই আদালতে বিচারের মুখোমুখি। ফিলিপাইনে তাঁর মাদকবিরোধী অভিযানের প্রতি একাংশের সমর্থন থাকলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এই অভিযানের গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে আইন ও মানবাধিকার উপেক্ষা করলে রাষ্ট্রের জন্য নতুন সংকট তৈরি হতে পারে—ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা সে কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মাদক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। দেশে মাদকবিরোধী আইন থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এর যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এলাকায় শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পেরেছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত মাদকের সরবরাহ ও বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। শিশু-কিশোর, তরুণ ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে পড়ছেন। এর ফলে মানুষের কর্মশক্তি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মাদকাসক্তির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সম্পর্কও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হত্যা, অস্ত্রের ব্যবহার ও চোরাচালানের মতো ঘটনা ঘটছে। নারী ও শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রেও মাদকের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অপরাধী চক্রের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র ও মানব পাচারের নেটওয়ার্ক বিস্তারের আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের পেছনে মাদকের সহজলভ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বহু অপরাধের সঙ্গে মাদক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। মাদক সরবরাহ ও বিক্রির নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব হলে অপরাধের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে। তবে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, সরবরাহ ও খুচরা বিক্রির প্রতিটি স্তরে কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
অতীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে মাদক ব্যবসার শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও বারবার সামনে এসেছে। এমনকি অতীতে মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ফলে মাদকবিরোধী অভিযান অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদক নির্মূলে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরির বিষয়টি নতুন নয়। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি ডিভিশন বেঞ্চ দেশের শীর্ষ মাদক কারবারিদের নাম-ঠিকানাসহ তালিকা দাখিলের জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশনার পর প্রায় তিন হাজার মাদক ব্যবসায়ীর একটি তালিকা প্রস্তুত করা হলেও অজ্ঞাত কারণে তা আদালতে জমা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাতে ২৯২ জন গডফাদার এবং চার হাজার শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকা চূড়ান্ত করার তথ্য সামনে এসেছে। এই তালিকার ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে মাদকবিরোধী অভিযান আরও ফলপ্রসূ হতে পারে।
পুলিশের মহাপরিদর্শকও মাদকবিরোধী অভিযানকে পুলিশের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাদকসংক্রান্ত মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো দূর করা জরুরি। কারণ, মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া অনেক আসামি পরবর্তী সময়ে আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন। অনেক মামলা সাক্ষীর অভাব ও প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণের দুর্বলতার কারণে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত পরিণতিতে পৌঁছাতে পারছে না।
মাদক চোরাচালানের মতো গুরুতর অপরাধের জন্য প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু শুধু কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেই মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অপরাধ প্রমাণের জন্য নির্ভরযোগ্য তদন্ত, পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ, দ্রুত বিচার এবং রায়ের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার পেছনে থাকা অর্থের উৎস, প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক এবং সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইকে সফল করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিতভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। জাতীয় সংসদের সদস্যদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকাকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা দেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে মাদকবিরোধী সচেতনতা, প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে মাদক উৎপাদনকারী, সরবরাহকারী, ব্যবসায়ী এবং সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাব যেন কোনোভাবেই আইনের প্রয়োগে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে ডোপ টেস্টের কার্যকর প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। গাড়িচালকদের জন্য ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ থাকলেও এর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনসম্মত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডোপ টেস্ট চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এসব পরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, যথাযথ প্রক্রিয়া ও পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাদক ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা। অতীতে দেখা গেছে, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অপরাধীরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সব রাজনৈতিক দলকে মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানি ও মাদক সিন্ডিকেটের গডফাদারদের আশ্রয় না দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সরাসরি জড়িত। তাই মাদকবিরোধী অভিযানকে সাময়িক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। কঠোর আইন প্রয়োগ, নিরপেক্ষ বিচার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সংকট মোকাবিলা করতে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান একটি বড় পরীক্ষা। এই যুদ্ধে সফল হতে পারলে শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণই নয়, দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হবে। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে দেশের অগ্রযাত্রা আরও শক্তিশালী হবে। কারণ, মাদকের বিরুদ্ধে জয় মানেই একটি সুস্থ, নিরাপদ, কর্মক্ষম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে বড় বিজয়।
[sharethis-inline-buttons]
আপনার মতামত লিখুন :