• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৩ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২ মার্চ, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২ মার্চ, ২০২৬
Designed by Nagorikit.com

সমাজে ধর্ষণের কালো ছায়া, আতঙ্কে জনসাধারণ

কুমিল্লা জার্নাল
[sharethis-inline-buttons]

মোতাহের উদ্দিন
শিক্ষার্থী,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সমাজে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের এক নির্মম চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সংবাদপত্রের পাতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই প্রতিনিয়ত সামনে আসছে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার ভয়াবহ খবর। বাস্তবতা হলো, ধর্ষণ শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি নারীর জীবন, একটি পরিবারের মানসিক বিপর্যয় এবং পুরো সমাজের নৈতিক সংকট।
এই কঠিন বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারগুলো দিন দিন বেশি শঙ্কিত হয়ে উঠছে। বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই অনেকের মনে কাজ করে এক অদৃশ্য ভয় কখন, কোথায়, কী ঘটতে পারে, সেই অনিশ্চয়তা যেন সর্বক্ষণ তাড়া করে ফেরে।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ইকোপার্ক এলাকায় সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা জনমনে নতুন করে আতঙ্কের সঞ্চার করেছে। এমন ঘটনা কেবল ক্ষোভই বাড়ায় না, মানুষের নিরাপত্তাবোধকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান: উদ্বেগ বাড়ছে

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ধর্ষণের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে মোট ৩৬৪টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্তই ঘটেছে ৩৫৪টি ঘটনা।

আরও উদ্বেগজনক হলো, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে শিশু ধর্ষণের হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানানো হয়েছে। UNICEF বাংলাদেশ এই পরিস্থিতিকে শিশুদের জন্য “ভয়াবহ” বলে উল্লেখ করেছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকাশিত পরিসংখ্যানের বাইরেও বহু ঘটনা সামাজিক লজ্জা, ভয় কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সামনে আসে না। ফলে প্রকৃত চিত্র আরও গভীর হতে পারে।

আতঙ্কে জনপদ: নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী ও কিশোরী সন্ধ্যার পর একা চলাচলে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন। গণপরিবহন, নির্জন রাস্তা কিংবা কর্মস্থলে যাতায়াত সব ক্ষেত্রেই ভয় যেন এক নীরব সঙ্গী।
দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করছে যে, অপরাধীরা হয়তো আইনের কঠোরতাকে আর গুরুত্ব দিচ্ছে না। বিচার বিলম্বিত হলে বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এই ভয় ও অবিশ্বাস আরও বাড়ে।

ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা একজন ব্যক্তিকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়, কিন্তু তার প্রভাব সেখানেই থেমে থাকে না। পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং বৃহত্তর সমাজও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক ভুক্তভোগী দীর্ঘমেয়াদি ট্রমার মধ্যে থাকেন, সামাজিক কটূক্তি ও দোষারোপের শিকার হন। এতে পুনর্বাসন আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
নারীদের স্বাধীন চলাচল, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিবারগুলো কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগে ভোগে, যা ধীরে ধীরে সমাজে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে।

কাগজে-কলমে আইনি সুরক্ষা, বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে কঠোর আইন বিদ্যমান। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ৯ অনুযায়ী একক বা দলবদ্ধ ধর্ষণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড বা আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টার ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর শাস্তি।
এছাড়া ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২২ সালে সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা বাতিলের ফলে আদালতে ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আর নেই।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায় আইনের কঠোরতা থাকা সত্ত্বেও তার প্রয়োগ কতটা কার্যকর? মানবাধিকারকর্মীদের মতে, তদন্তের ধীরগতি, প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা এবং সামাজিক চাপ অনেক সময় বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। এতে ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন।

এই ব্যাধি বৃদ্ধির কারণ

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক সামাজিক ও মানসিক কারণ কাজ করছে। পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, মাদকাসক্তি, সহিংস কনটেন্টের সহজলভ্যতা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।

তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা। অপরাধের দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি না হলে অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা সাহস পেয়ে যায় এমন মত আইন বিশ্লেষকদের।

প্রতিকার: সম্মিলিত সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল কঠোর আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, স্কুল পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষা জোরদার করা, পরিবারে পারস্পরিক সম্মান ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চা করা। নারীর প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তোলাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ভিত্তি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগীদের মানসিক ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। গণমাধ্যমের দায়িত্ব রয়েছে সংবেদনশীলতা বজায় রেখে দায়িত্বশীল প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়,এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তির ওপর গভীর আঘাত। নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, পরিবার ও নাগরিক সবাইকে একযোগে দায়িত্ব নিতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

[sharethis-inline-buttons]

আরও পড়ুন

  • লিড এর আরও খবর