• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬ এপ্রিল, ২০২৩
সর্বশেষ আপডেট : ৬ এপ্রিল, ২০২৩
Designed by Nagorikit.com

২০ লাখ টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে পরকীয়ার অভিযোগে শ্বশুর বাড়ি ফেলে যায় স্বামী

কুমিল্লা জার্নাল

নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে খাদিজা আক্তার রিয়ার (২৪) বসবাস কুমিল্লা নাঙ্গলকোট উপজেলার বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের দক্ষিণ নূরপুর গ্রামে। বিয়ে নিয়ে রিয়ার হাজারো রঙিন স্বপ্ন ছিল। আট বছর পূর্বে ২০১৪ সালে একই বাড়ির দুবাই প্রবাসী জেঠাতো ভাই সাইফুল ইসলামের (৩২) সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের ঠিক দুই বছর পর ২০১৬ সালে স্ত্রী কে নিয়ে দুবাই চলে যান স্বামী। বিদেশে স্ব-পরিবারে ভালোই চলছিল তাদের দাম্পত্য জীবন। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি রিয়ার জীবনে। পরিকল্পিতভাবে ২০২২ সালের জুন মাসে রিয়া’কে দুবাই থেকে দেশে পাঠিয়ে দেয় তার স্বামী সাইফুল। রিয়ার ঠিকানা এখন বাপের বাড়ি।

 

স্থানীয়রা জানান, পরিবারের অমতে সেসময় সাইফুল ইসলাম জোরপূর্বক’ই বিয়ে করেছিল রিয়া’কে। বিয়ের একপর্যায়ে পরিবার মেনে নেয়। পরবর্তীতে তারা দুবাই চলে যায়। সেখানে ৬ বছর থাকার পর ৮ মাস পূর্বে রিয়াকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় স্বামী। কিছুদিন পূর্বে হঠাৎ করেই প্রবাসী সাইফুল ইসলাম স্ত্রীকে কিছু না জানিয়ে তার প্রবাসের ব্যবসায়িক পার্টনার হালেম এর ভাগ্নী জান্নাত কে বিয়ে করে দুবাই নিয়ে যায়। বিষয়টি জানাজানি হলে রিয়া ও সাইফুলের পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। একপর্যায়ে রিয়া দৌড়ে গিয়ে সাইফুলের পরিবারকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করতে গেলে উভয়পক্ষের মাঝে ঝগড়ার সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে থানায়ও অভিযোগ করে দু’পক্ষ।

 

স্থানীয়রা আরো জানান, মূলত সাইফুল ইসলামের বাবার নাম হারুন অর রশিদ, মায়ের নাম শাহিদা বেগম, স্থায়ী ঠিকানা বাঙ্গড্ডা, নাঙ্গলকোট হলেও দুবাই যাওয়ার সময় সাইফুল ইসলাম সঠিক নাম ঠিকানা গোপন রেখে নিজের পাসপোর্ট ও কাবিননামায় তার নাম দিয়েছিল আজিজুল, বাবার নাম দিয়েছিল নুরুল ইসলাম, মায়ের নাম দিয়েছিল রোকেয়া বেগম ও স্থায়ী ঠিকানা দিয়েছিল শ্রীপুর, গাজীপুর। এ থেকে বুঝা যায় প্রবাসী সাইফুল প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করেছেন আগ থেকেই।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উভয়পক্ষের নিকট আত্মীয় ডা. মিজানুর রহমান বলেন, সাইফুল এবং রিয়া আমার মামাতো শ্যালক ও শ্যালিকা। মূলত ঐ সময় সাইফুল পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গিয়েই একপ্রকার জোর করেই রিয়াকে বিয়ে করেছিল। যাক পরবর্তীতে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। সেখানে ৬/৭ বছর থাকার পর হঠাৎ একদিন সাইফুল আমাকে ফোন করে বলতেছে রিয়াকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিছি। খুব কৌশল করেই সে রিয়াকে বাড়িতে পাঠাইছে যা সাইফুল পরবর্তীতে আমার কাছে স্বীকার করেছে, পাঠাইছে তার ভিতরে দুরভিসন্ধি ছিল। পাঠানোর পর সে রিয়ার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে সাইফুল বিয়েটা ভেঙে ফেলার জন্যই এমন করেছে। ইতোমধ্যে আমরা জানতে পারলাম সে জান্নাত নামে একটা মেয়েকে বিয়ে করে দুবাইতে নিয়ে গেছে। তার মা সহ ওখানে নিয়ে গেছে, ওখানে বিয়ে করেছে, ওখানে রেখেছে। মূলত ডিভোর্স দেয়ার উদ্দেশ্যেই সাইফুল এই পায়তারাগুলো করেছে। আর তাকে ডিভোর্স দিতে পারছে না কারণ সাইফুল গাজীপুরের ঠিকানায় পাসপোর্ট ও কাবিন করেছে।

 

সাইফুলের অভিযোগের ভিত্তিতে রিয়ার পরকীয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, এগুলো মিথ্যা, মূলত তাকে অপমান করার জন্য এগুলো বলা হচ্ছে। তাকে ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি পর্দা করে, তার মাও পর্দা করে। আমাদের সাথেও দেখা দিতো না, তার মধ্যেই তো সাইফুলের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে। পরকীয়ার বিষয়টি সত্য নয়। আরেকটি বিষয় বলে রাখি সাইফুল পরে জান্নাত নামে যেই মেয়েটিকে বিয়ে করেছে আমি তার ফুফাদের বাড়িতে গেছিলাম। গিয়ে দেখি হালেম হলো তার বিদেশের ব্যবসায়িক পার্টনার তার ভাগ্নীকে সে বিয়ে করেছে, তার বোন জামাইকে আমি বলে এসেছি যে তার বিয়েটা ভাঙা ঠিক হবে না, আপনার মেয়েটা এখন বিয়ে দিয়েন না। যদি উভয়পক্ষের কোনো ফয়সালা হয় তারপর আপনারা সিদ্ধান্ত নিয়েন। তারা আমার এ কথাটা রক্ষা করে নাই। তারা সিস্টেমে মেয়েটা দুবাই পাঠাই দিছে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাদের বাড়ির এক মহিলা বলেন, আমারও মেয়ে আছে কারও মেয়ের ব্যাপারে মিথ্যা বলতে পারবো না। সাইফুল রিয়াকে দেশে পাঠিয়ে দিয়ে আরেকটি বিয়ে করার পর বলতেছে রিয়া নাকি পরকীয়ায় লিপ্ত! আসলে রিয়া ছোট বেলা থেকেই খুব নম্র, ভদ্র ও পর্দাশীল মেয়ে। আর তার বিয়ের পরপরই তো সে স্বামীর সাথে দুবাই চলে গেছে, ওখানে তো সে স্বামীর কাছেই ছিল। পরকীয়া করবে কখন? রিয়ার শ্বশুর-শ্বাশুড়িও সাথে ছিল সেখানে। নিজের স্ত্রীর নামে এখন এগুলো বলা ঠিক না।

 

সাইফুল ও রিয়ার চাচাতো ভাই জামাল হোসেন বলেন, রিয়াকে দেশে পাঠানোর পর সাইফুল বলেছিল বিল্ডিং ঘরের কাজ সম্পন্ন হলে রিয়াকে আবার নিয়ে যাবে দুবাই। কিন্তু সে ঘরের কাজ শেষ করতে না করতেই আরেকটা বিয়ে করে ফেলেছে। এটা তো ঠিক হয়নি।

 

এ বিষয়ে রিয়া বলেন, বিয়ের পর আমি ৬ বছর আমার স্বামীর কাছে থাকি। কোনোদিন দুই কথা হয়নি, সে কারো কাছে আমার ব্যাপারে কোনো বিচারও দেয়া লাগে নি। এখন আমাকে মিথ্যে অপবাদ দিচ্ছে আমি নাকি পরকীয়া করি। আমরা এত বছর একসাথেই তো থাকি, আমার শ্বশুর শ্বাশুড়িও আমার সাথে ছিল তাহলে কিভাবে আমি পরকীয়া করি? সে এখন উল্টো অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করেই আমাকে দোষী বানাচ্ছে। আমাকে দুবাই থেকে পাঠানোর পরপরই সে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। আমার ভরণপোষণও দেয় নাই। বরং আমার পরিবারকে চাপ দিচ্ছে যৌতুক হিসেবে ২০ লক্ষ টাকা দেয়ার জন্য। আমার পরিবার তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

 

পরবর্তীতে গত সোমবার আমার চাচাতো ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পারি আমার স্বামী আরেকটা বিয়ে করে ফেলেছে। এ বিষয়ে আমার শ্বাশুড়ি’কে জিজ্ঞেস করতে গেলে তারা আমাকে মারধর করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।

 

প্লাট কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে রিয়া আরো জানান, আমার স্বামী যেই প্লাট আমার পরিবারের নামে দিয়েছে বলতেছে আসলে আমার বিয়ের আগেই এই প্লাট আমার আম্মুর নামে কিস্তিতে নিয়েছে আব্বু। এটার মাত্র ১০ কিস্তি শেষ হয়েছে এখনো কিস্তি চলে। তাছাড়া সে এখনো এক কোটি টাকা ঋণী, প্লাট কিনে কিভাবে? ডকুমেন্টস থাকলে দেখাতে বলেন? বরং তার ঘর তৈরির সময় আমার ১০ ভরি স্বর্ণ বিক্রি করে ইয়াছিন কাকার কাছে ৭ লক্ষ টাকা দিয়েছি। তবুও তার কাছে থাকতে পারিনি।

 

এ বিষয়ে অভিযুক্ত সাইফুলের বাবা হারুন অর রশিদের কাছে জানতে চাইলে তিনি সাইফুলের বিয়ে ও পরকীয়ার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান এবং রিয়া তাদের কাছেই দুবাইতে একসাথে ছিল বলেও স্বীকার করেন।

 

রিয়ার মা লাইলী বেগম বলেন, আমার মেয়ে তার স্বামীর আরেক বিয়ের খবর শুনে পাগলপ্রায় হয়ে ছুটে যান শ্বশুর বাড়ি। সেখানে গেলে তারা আমার মেয়েকে মারধর করে, পরে খবর পেয়ে আমি সেখানে গিয়ে আমার মেয়েকে উদ্ধার করি। সাইফুল দুবাই থাকাকালীন সময়ে আমাকে দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কিস্তি তুলে বিদেশে ব্যবসা করেছে, মেয়ের দিকে তাকিয়ে সব মেনে নিয়েছি। এখন আবার সাইফুল আমার মেয়েকে বাড়িতে রেখে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে বিদেশে নিয়ে গেছে। আমার মেয়ের কোনো অপরাধ না পেয়ে, নিজের অপকর্ম ঢাকা দিতে এখন পরকীয়ার নাটক সাজিয়েছে সাইফুল। আমি রিয়ার মা হিসেবে তা মেনে নিতে পারি না। আমি তার বিচার চাই।

আরও পড়ুন

  • কুমিল্লা এর আরও খবর