লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধিঃ
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ থানা পুলিশের বিরুদ্ধে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তাকে লাঞ্চিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মনোহরগঞ্জ থানার খোদ অফিসার ইনচার্জের (ওসি) শাহিনূর ইসলামের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ওঠেছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও ঘটনায় সত্যতার প্রমাণ মিলেছে।
এই ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। না হয় কঠোর কর্মসূচির ডাক দেবেন বলে তাঁরা সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
মনোহরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শাহরিয়ার ইনাম খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মনোহরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে ‘পাবলিক অ্যাসল্ট’ বা গণপিটুনির শিকার নাঈম (৩০) নামের এক ব্যক্তিকে মনোহরগঞ্জ থানা পুলিশ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে যান। ওই সময় কর্তব্যরত চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। আহত ওই রোগীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ও শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে রেফার্ড করেন।
চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ ফয়জুর রহমানের অভিযোগ, তিনি গুরুতর আহত ওই রোগীকে রেফার্ডের কথা বলতেই ওসি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং তাঁর ওপর চড়াও হন। এ সময় ওসি তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত অশালীন আচরণ করেন। এ ছাড়া, ওসি উপস্থিত সবার সামনে চিকিৎসকদের চোর আখ্যায়িত করে হাসপাতালের ওষুধ বাইরে বিক্রি করে বলেও অপবাদ দেন। একপর্যায়ে ওসির নির্দেশে পুলিশ সদস্যরা আহত ওই রোগীকে হাসপাতালে ফেলে রেখেই চলে যান। ফলে রোগীর আইনি প্রক্রিয়া ও চিকিৎসাসেবা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। বিষয়টি ওই চিকিৎসা কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতণ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
এই ঘটনায় মনোহরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয়াংকা চক্রবর্তী হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. শাহরিয়ার ইনাম খানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত গঠণ করেন। কমিটির অন্যান্যরা হলেন- হাসপাতালের সহকারী সার্জন ডা. এস এম ফারুক হোসাইন, সদস্য এবং ডা. নুর মোহাম্মদ, সদস্য সচিব।
কমিটির প্রধান ডা. মো. শাহরিয়ার ইনাম খান তদন্ত কমিটির অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে ঘটনার সময় সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। কমিটি ঘটনার তদন্ত ও পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাবর একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান ডা. মো. শাহরিয়ার ইনাম খান জানান, পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ মিলেছে। পুলিশ কর্মকর্তার আচরণ অপেশাদার এবং একজন গেজেটেড কর্মকর্তার প্রতি চরম অবমাননাকর বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, পুলিশের পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই সাথে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ‘ওষুধ চুরির’ অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সরকারি চাকরির শৃংখলা ও আচরণবিধি পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন তদন্ত কমিটি।
গতকাল বুধবার (১ এপ্রিল) দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া, ভবিষ্যতে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল চত্বরে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করেন।
মনোহরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয়াংকা চক্রবর্তী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে এই প্রতিবেদককে বলেন, “হাসপাতালের মতো একটি সংবেদনশীল স্থানে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন (সিএস) এবং পুলিশ সুপারকে (এসপি) লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে।
এই ব্যাপারে মনোহরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহিনূর ইসলামের মুঠোফোনে (০১৩২০-১১৪৩৩৪) ও হোয়াটসআপে একাধিকবার কল দিলেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আপনার মতামত লিখুন :