কুমিল্লা প্রতিনিধি:কুমিল্লায় মাওলানা সালমানের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাটি ‘স্ট্রোকজনিত স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলে প্রচার করা হলেও পরে মরদেহে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলে বিষয়টি হত্যাকাণ্ড হিসেবে সামনে আসে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।তবে তদন্ত এখনো চলমান থাকায় হত্যার পেছনের প্রকৃত কারণ বা মোটিভ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি পুলিশ কর্মকর্তারা।পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে কুমিল্লা নগরীর একটি বাসায় মাওলানা সালমানের মৃত্যু হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে দাবি করা হয়, তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং স্ট্রোকের কারণে মারা যান। মৃত্যুর পরপরই বিকেলে দ্রুত দাফনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছিল।কিন্তু মরদেহে মাথা ও কানের পাশে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।পরে লালমাই থানা পুলিশ মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে দাফন সম্পন্ন হয়।ঘটনার পরপরই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে নিহতের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস, তাঁর ভাই মোহাম্মদ উল্লাহ এবং ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ আলমকে গ্রেপ্তার করে আদালতে প্রেরণ করা হয়।পরদিন কুমিল্লা সদর সার্কেল অফিসারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম নগরীর হাউজিং এস্টেট ৩ নম্বর সেকশন এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ সময় নিহতের বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত আলামতের মধ্যে রয়েছে হাম্বলদিস্তা, দা-বটি, রক্তাক্ত জামা, রক্তাক্ত মশারি এবং রক্তমাখা বালিশ। এসব আলামত বর্তমানে তদন্তের অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।পরে গ্রেপ্তার তিনজনকে গত ৬ মার্চ আদালতের অনুমতি নিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই এসব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।মামলার বাদী ও নিহতের ছোট ভাই এহসানুল হক বলেন,“আমার ভাই একজন শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তাঁর এমন মৃত্যু আমাদের পরিবার কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। আমরা চাই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।”তিনি আরও বলেন,“প্রথমে ঘটনাটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু পরে মরদেহে আঘাতের চিহ্ন দেখে আমাদের সন্দেহ হয়। এরপর আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করি।”এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবিতে সরব হয়েছেন স্থানীয় উলামা সমাজ ও বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের নেতারা। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন,“ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন আলামত যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান বলেন,“মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।”এ ঘটনায় পুরো কুমিল্লা জুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে হত্যার পেছনের প্রকৃত কারণ ও পুরো ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
[sharethis-inline-buttons]
আপনার মতামত লিখুন :