বিশেষ প্রতিনিধি, কুমিল্লা।
রোগ নিরাময়ে চিকিৎসার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ঔষধ। চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক ঔষধ গ্রহণের মাধ্যমেই রোগমুক্তির প্রত্যাশা করেন রোগীরা। কিন্তু সেই ঔষধ বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় ড্রাগ লাইসেন্স পেতে যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই পড়তে হয় দুর্নীতির খপ্পরে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে অনেক ক্ষেত্রে নীতিমালা মানার বদলে অবৈধ পথে হাঁটার প্রবণতাও বাড়ে, যার পরিণতিতে নকল কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ বিক্রির মতো ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লা জেলা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে খুচরা ও পাইকারি ঔষধ বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের ড্রাগ লাইসেন্স পেতে সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়াও বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে আবেদনকারীদের। সরকারি বিধি অনুযায়ী বর্তমানে ড্রাগ লাইসেন্সের জন্য আবেদন থেকে শুরু করে ফি জমা দেওয়া পর্যন্ত সব প্রক্রিয়া অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা। নিয়ম অনুযায়ী পৌর শহরের ফার্মেসির ক্ষেত্রে লাইসেন্স ফি ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং উপজেলা শহরের ক্ষেত্রে ১ হাজার ৫০০ টাকা, এর সঙ্গে যুক্ত হয় অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ ভ্যাট। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। একাধিক ফার্মেসি মালিকের অভিযোগ, কুমিল্লা ওষুধ প্রশাসন কার্যালয়ে লাইসেন্স করতে গেলে প্রথমেই তাদের বলা হয় যে বর্তমানে নতুন ড্রাগ লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না। তবে, পরে অনুরোধ করলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কুমিল্লার আপার ডিভিশন কর্মকর্তা মো. শওকত সরকার চৌধুরীরমাধ্যমে ভিন্ন বার্তা পাওয়া যায়। তিনি লাইসেন্স দেওয়ার বদৌলতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থের দাবি করে বলেন, টাকা না দিলে ‘ম্যাডাম’ স্বাক্ষর দিবেন না। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ফি’র বাইরে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে তবেই লাইসেন্স পাওয়ার পথ খুলে যায়। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই অতিরিক্ত টাকার পরিমাণ ২০ হাজার থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। লাইসেন্স প্রক্রিয়া শুরুর আগে অর্ধেক টাকা এবং লাইসেন্স সম্পন্ন হওয়ার পর বাকি টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকের ভাষ্য, এ টাকা না দিলে ফাইল এগোয় না এবং মেলে না কার্যালয়ের সহকারী পরিচালকের অনুমতিও। এ অভিযোগের সমর্থনে প্রতিবেদকের হাতে একটি অডিও রেকর্ডও এসেছে। ওই রেকর্ডে আপার ডিভিশন কর্মকর্তা মো. শওকত সরকার চৌধুরী এক লাইসেন্স প্রত্যাশীর সঙ্গে কথোপকথনে বলতে শোনা যায়, “আপনি টাকা দিয়েছেন, নিশ্চিন্তে থাকেন। সব দায়ভার আমার। লাইসেন্স পেলেই তো হয় আপনার।” এদিকে, শুধু নতুন লাইসেন্স নয়, লাইসেন্স নবায়নেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক ফার্মেসি মালিকের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স নবায়নের জন্য পৌর শহরের ক্ষেত্রে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং উপজেলা শহরের ক্ষেত্রে ৭০০ টাকা ফি জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ওষুধ প্রশাসন কার্যালয়ে গেলে তার চেয়ে বেশি অর্থ দাবি করা হয়। অনেক ফার্মেসী মালিকের অভিযোগ, লাইসেন্স নবায়নে পৌর শহরের ফার্মেসি থেকে অন্তত ১ হাজার টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয় এবং উপজেলা শহরের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ আরও বেশি। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নবায়ন প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এদিকে, কল রেকর্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কুমিল্লার আপার ডিভিশন কর্মকর্তা শওকত সরকার চৌধুরী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ ধরণের কথা আমি বলিনি৷ লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা। আমি এগুলোর মধ্যে নাই। এক পর্যায়ে প্রতিবেদককে এই কর্মকর্তা বলেন, আপনাদের বা আপনাদের আত্মীয় স্বজনের এ সংক্রান্ত যেকোনো কাজে আমার কাছে আসবেন, ভাই। আপনার ভিজিটিং কার্ড টা সাথে দিয়ে পাঠালেই হবে। তবে, এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুমিল্লা জেলা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সালমা সিদ্দিকা।। তিনি বলেন, অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি আপার ডিভিশন কর্মকর্তা শওকতের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠে থাকে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে ড্রাগ লাইসেন্স অনুমোদনের বিষয়টি সরাসরি ঢাকা থেকে সম্পন্ন হয় এবং এতে তার স্বাক্ষরের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। লাইসেন্স নবায়নে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে সালমা সিদ্দিকা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে যেটিকে অতিরিক্ত ফি বলা হচ্ছে, সেটি মূলত পূর্ববর্তী বছরের বকেয়া ভ্যাট। তার দাবি, এর বাইরে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানতে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায় নি। তবে, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগগুলো সম্পর্কে আমরা খতিয়ে দেখবো। জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুমিল্লা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে ড্রাগ লাইসেন্স ও নবায়ন প্রক্রিয়া ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী স্বচ্ছ ও অনলাইনভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করা হলে একদিকে যেমন দুর্নীতি কমবে, তেমনি ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের হয়রানিও কমবে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
[sharethis-inline-buttons]
আপনার মতামত লিখুন :