বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হিসেবে অটুট অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম, যেখানে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, দেশটিতে দুর্নীতি কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে না হলেও কিছু স্থানে সামান্য উন্নতি হয়েছে।
দেশি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রিপোর্ট শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং দেশের প্রাত্যহিক জীবনে দুর্নীতির প্রকৃত চিত্রের প্রতিফলন। সরকারি সেবা, আইন প্রণয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য খাতে দুর্নীতি এখনো দৃশ্যমান। সাধারণ মানুষ এবং রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা যে ধরনের অভিজ্ঞতা ও মন্তব্য করেন, তা স্পষ্টভাবে বোঝায় যে দেশের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে রয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক সিনিয়র সাংবাদিকের বক্তব্য একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, “যেহেতু দুর্নীতি বন্ধ করা যাচ্ছে না, তাই এটাকে ওয়ে অব লাইফ বা আইনসিদ্ধভাবে গ্রহণ করা উচিত।” অনেকেই হতাশা প্রকাশের জন্য এই ধরনের মন্তব্য করেন, কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করান, এমন মনোভাব সমাজে অপরাধ এবং দুর্নীতি আরও উসকে দেয়। এটি শুধু অপরাধীদের সাহস বাড়ায় না, বরং সাধারণ মানুষকেও অনুপ্রাণিত করে অসৎ উপায় অবলম্বনের জন্য।
দুর্নীতির মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো বেতন এবং আর্থিক সুবিধার বৈষম্য। সরকারী খাতের উচ্চ পদগুলোতে বেতন, বোনাস এবং নানা আর্থিক সুবিধা অনেক বেশি, যেখানে নিম্ন পদে থাকা কর্মকর্তাদের সুবিধা তুলনামূলক কম। যেমন, একজন উপসচিবের গাড়ির তেলের খরচ একজন নিম্ন পদস্থ কর্মকর্তার পুরো মাসের বেতনের সমান। ফলে নিচু পদে থাকা কর্মকর্তারা নিজেদের জীবন-যাত্রার খরচ সামলাতে ‘অভিযোজন’ হিসেবে ঘুষ গ্রহণ ও অন্যান্য দুর্নীতির পথে চলে।
এছাড়া ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ সত্ত্বেও সেবা কার্যক্রমে নাগরিকরা অনলাইনের মাধ্যমে সুবিধা পান না। সার্ভার প্রায়শই ডাউন থাকে বা অনলাইন আবেদন করেও সেবা মিলছে না। ফলে নাগরিকরা বাধ্য হয়ে সরাসরি অফিসে আসে এবং কাজ সম্পন্ন করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করে। এই ‘স্পিড মানি’ বা ঘুষের সংস্কৃতি সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিকে perpetuate করে।
দুর্নীতির বিষয়ে অন্যান্য সমস্যা হলো প্রশাসনিক তদারকি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। কিছু উচ্চ পদে থাকা কর্মকর্তারা পদ পাওয়ার জন্য মোটা অংকের ঘুষ দিতে বাধ্য হন। এই টাকা সাধারণ জনগণকে দোষারোপ করে তুলতে হয়। লোভনীয় এবং আকর্ষণীয় পদগুলো অনাকর্ষণীয় করতে হবে। এর জন্য সেই পদে বসা ব্যক্তিদের ওপর পর্যবেক্ষণ, বড় ধরনের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং সরকারি কার্যক্রম অনলাইনে সম্পূর্ণরূপে বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি।
বিশ্লেষকরা মনে করান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনটি মূল দিক গুরুত্বপূর্ণ:
১. বেতন ও আর্থিক সুবিধার সমন্বয়: উচ্চ ও নিম্ন পদে বেতন ও সুবিধার সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটি শুধুমাত্র বেতন বাড়ানো নয়, বরং সামাজিক ও আর্থিক সাম্য নিশ্চিত করা। সাম্য না থাকলে, ডিজিটালাইজেশন বা অন্যান্য নীতি কার্যকর হলেও ঘুষের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকবে।
২. জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন: সরকার সব প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিবিরোধী শূন্য সহনশীল নীতি বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। দুর্নীতিবাজদের দ্রুত শনাক্তকরণ, বিচারের আওতায় আনা এবং শাস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
৩. রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা: সরকার সত্যিই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে চায় কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে। অনেক সময় সরকার রাজনৈতিক কারণে গণকর্মচারীদের দিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন করায়, অন্যায় নিয়ে চোখ বন্ধ রাখে। এই অবস্থা দূর করতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সাধারণ মানুষকেও ভূমিকা রাখতে হবে। কেউ যদি সহজ-সরলভাবে ‘সবাই তো ঘুষ খাচ্ছে’ বা ‘এটা ওয়ে অব লাইফ’ মনে করে, তবে তা সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিডিয়া এবং সামাজিক সংগঠনকে এই বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
দুর্নীতির সমস্যার সমাধানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সরকারি সেবা প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও বিকেন্দ্রীকরণ করা। যে সেবা নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা অনলাইন পদ্ধতিতে দেওয়া হলে ঘুষের প্রয়োজন কমবে। স্থানীয় পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দিলে কেউ আর ওই পদকে ‘লোভনীয়’ ভাববে না। ছোট পদের কর্মকর্তা যারা ছোট অংকের ঘুষ গ্রহণ করে, তাদেরও সমন্বিত নীতি ও তদারকির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সমগ্র বিষয়টি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুর্নীতির মাত্রা কমানো শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বা সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নয়। এটি সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় নীতি, বেতন কাঠামো, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, ডিজিটালাইজেশন, গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা মিলিয়ে কাজ করলে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব।
বাংলাদেশে দুর্নীতি বন্ধ করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। তবে ‘অভিযোজন’ বা খাপ খাইয়ে নেওয়ার মনোভাব গ্রহণ করা সমাধান হতে পারে না। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য প্রয়োজন যথাযথ নীতি, সমন্বয়, কঠোর শাস্তি এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নাগরিকরা যাতে সরকারি সেবা সহজ ও স্বচ্ছভাবে পেতে পারে, তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সঠিক পদক্ষেপ এবং স্থায়ী মনোভাব থাকলে বাংলাদেশে দুর্নীতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। মোহাম্মদ জামাল হোসেন , প্রধান শিক্ষক, চৌদ্দগ্রাম মাধ্যমিক পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,
[sharethis-inline-buttons]
আপনার মতামত লিখুন :