• ঢাকা
  • বুধবার, ২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২৬ আগস্ট, ২০২৬
Designed by Nagorikit.com

কুমিল্লা জার্নাল
[sharethis-inline-buttons]

হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। মুসলিম ইতিহাসে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। এ মাসেই মহান আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ সত্তা, মানবজাতির পথপ্রদর্শক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে আগমন করান। যদিও তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবে ১২ই রবিউল আউয়াল সর্বাধিক প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য মত। দিন হিসেবে এ দিনেই তিনি পৃথিবীতে আগমন করেন এবং সত্যের বাণী প্রচারের দায়িত্ব পালন শেষে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে এ দিনেই পৃথিবী ত্যাগ করেন।

অন্ধকার যুগে আলোর বার্তা

মহানবী (সা.)-এর আগমনের পূর্বে মক্কা ছিল অন্যায়, অত্যাচার, সামাজিক বৈষম্য, হিংসা ও বিদ্বেষে জর্জরিত এক চরম বিশৃঙ্খল জনপদ। আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-কে প্রেরণের মাধ্যমে সেই অন্ধকারে নিমজ্জিত আরব সমাজকে ইসলামের শীতল ছায়াতলে নিয়ে আসেন। তাঁর দাওয়াতের মূল বার্তা ছিল এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীলতা।৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় প্রথম অহি লাভের মাধ্যমে তাঁর নবুয়তি জীবনের সূচনা হয়। পরবর্তী ২৩ বছরের নবুয়তি জীবনে তিনি মানুষকে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার শিক্ষা দেননি; বরং ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই ন্যায়, নীতি ও নৈতিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

মহানবীর মানবিক দর্শন

মহানবী (সা.) ছিলেন মানবিক আদর্শের এক মূর্ত প্রতীক। তাঁর চরিত্র ও জীবনে ফুটে উঠেছে মানবিক মর্যাদা, সাম্য, প্রতিবেশীর অধিকার, এতিম ও অসহায়ের প্রতি সহানুভূতি, নারীর অধিকার, ক্ষমা, সহনশীলতা, সততা ও আমানতদারির মতো মহান গুণাবলী। তাঁর আনীত জীবনব্যবস্থায় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও রাজনীতির সর্বাঙ্গীন বিধান অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি ছিলেন ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব।আল্লাহ তাআলা তাঁর চরিত্র সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন:“এবং নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।”(সুরা আল-কলাম, আয়াত: ৪)আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:“আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছ। যদি তুমি রুঢ় ও কঠোরচিত্ত হতে, তবে তারা তোমার চারপাশ থেকে সরে পড়ত। (সুরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৯)মহানবী (সা.) সত্যিকার অর্থেই ছিলেন বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ। মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও সহানুভূতি ছিল অতুলনীয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:“আপনাকে তো আমি সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।(সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)নবীজি (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) উত্তর দিয়েছিলেন:“পবিত্র কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।”* (আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৪২)

মদিনা সনদ: মানব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরতের পর শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুহাজির, আনসার এবং মদিনার বিভিন্ন ইহুদি ও পৌত্তলিক গোত্রকে নিয়ে মহানবী (সা.) যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন, তা ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত। এটি বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান। সামপ্রদায়িক সম্প্রীতি:বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোত্রের বৈরিতা দূর করে এটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করে। নাগরিক অধিকার: ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মদিনার সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদান করে। ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি:এই সনদের মাধ্যমে মদিনায় বিশ্বের প্রথম কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার উইলিয়াম মুর তাঁর The Life of Muhammad’গ্রন্থে লিখেছেন:“এই সনদ মহানবী (সা.)-এর প্রকৃত মহত্ত্ব ও অসাধারণ মননশীলতার পরিচায়ক, যা কেবল তাঁর নিজের যুগের জন্য নয়, বরং সর্বযুগের জন্য শ্রেষ্ঠ।”ইতিহাসবিদ প্রফেসর ড. এ কে এম ইয়াকুব হোসাইন লিখেছেন:“এই সনদের মাধ্যমে আরবে সর্বপ্রথম ইসলামী গণতন্ত্রের বীজ বপন করা হয়েছিল।

বিদায় হজের ভাষণ: বৈশ্বিক ইশতেহার

৬৩২ খ্রিস্টাব্দে আরাফার ময়দানে মহানবী (সা.) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এটি কেবল একটি ভাষণ ছিল না; বরং তা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের এক শাশ্বত সনদের মতো।বর্তমান বিশ্ব যখন বৈষম্য ও নৈতিক সংকট পার করছে, তখন বিদায় হজের ১২টি মৌলিক শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক:১. জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা২. বর্ণবাদমুক্ত সাম্যের সমাজ গঠন৩. সুদ (রিবা) নিষিদ্ধকরণ৪. নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা৫. ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহমর্মিতা৬. আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি৭. কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক অনুসরণ৮. নিয়মিত সালাত ও ইবাদত পালন৯. ইসলামের সার্বজনীন বার্তার প্রচার১০. নবুয়তের সমাপ্তি ও সত্যের ওপর অবিচলতা১১. আমানত রক্ষা করা১২. জুলুম ও অবিচার বর্জন করা

রবিউল আউয়াল মাসের শিক্ষণীয় আমল

ইসলামে কোনো মাসকে কেন্দ্র করে নিছক আনুষ্ঠানিকতার স্থান নেই; বরং প্রতিটি মুহূর্তকে আমলে রূপান্তর করাই মুসলমানের লক্ষ্য। রবিউল আউয়াল মাস আমাদের নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। এই মাসে করণীয় ৫টি গুরুত্বপূর্ণ আমল: বেশি বেশি দরুদ পাঠ: আল্লাহ তাআলা বলেন,“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পেশ করেন। হে ইমানদারগণ, তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পেশ করো।”(সুরা আহযাব, আয়াত: ৫৬) সোমবারে নফল রোজা রাখা: রাসুল (সা.) প্রতি সোমবার নফল রোজা রাখতেন। কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এ দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন (সুনানে তিরমিজি)। অনাহারী ও দুস্থদের সাহায্য করা:সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্রদের খাবার ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, “দান গুনাহকে এমনভাবে নিঃশেষ করে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।”(সুনানে তিরমিজি) তাহাজ্জুদ নামাজে যত্নবান হওয়া:শেষ রাতে সেজদানত হয়ে পাপের ক্ষমা ও হেদায়েত প্রার্থনা করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম পথ। চরিত্র গঠন ও সুন্নাহর অনুসরণ:মহানবীর পুরো জীবনকেই নিজের জন্য আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা।অনেকেই কেবল ১২ই রবিউল আউয়াল কেন্দ্রিক বিশেষ অনুষ্ঠান বা উদ্‌যাপনকে ধর্মের অঙ্গ মনে করেন। তবে বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলারদের মতে, এ দিনে নির্দিষ্ট কোনো উৎসব বা শোক পালন করা শরিয়তসম্মত নয়; কারণ সাহাবিদের যুগে এমন কোনো প্রচলন ছিল না। তাই দিবসকেন্দ্রিক কোনো আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মাসজুড়ে সুন্নাহ চর্চা, দরুদ পাঠ ও জনকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমেই নবীজির প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশ করা উচিত।

মোতাহের উদ্দিন শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[sharethis-inline-buttons]

আরও পড়ুন

  • ধর্মীয় এর আরও খবর