• ঢাকা
  • সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২৫ মে, ২০২৬
Designed by Nagorikit.com

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সমাজের অবক্ষয়

কুমিল্লা জার্নাল
[sharethis-inline-buttons]

ব বিভিন্ন অপরাধ, সহিংসতা, দুর্নীতি ও সামাজিক অনিয়মের ঘটনা যেন প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদপত্র কিংবা অনলাইন গণমাধ্যম যেদিকেই নজর দেওয়া হয়, সেদিকেই ধর্ষণ, অপরাধ, নির্যাতন ও সামাজিক অবক্ষয়ের নির্মম চিত্র ফুটে ওঠে। যে মাধ্যমগুলো একসময় মানুষের বিনোদন ও জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র ছিল, বর্তমানে সেসব মাধ্যমেও বিনোদনের পরিবর্তে সামাজিক অবক্ষয়ের নানা চিত্র দৃশ্যমান হচ্ছে।কিন্তু প্রশ্ন হলো এত ধর্ষণ, সহিংসতা ও নির্মমতার অবসানের কোনো উপায় কি নেই? ধর্ষক ও অত্যাচারকারীদের কি শাস্তির আওতায় এনে এসব নির্মমতা বন্ধ করা সম্ভব নয়? বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পূর্ণভাবে অপরাধ নির্মূল করা কঠিন হলেও সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়া এবং কার্যকর জবাবদিহিতার মাধ্যমে তা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।অন্যায় ও অপরাধ প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। দার্শনিক জ্যাঁ-জ্যাক রুশো এর রাষ্ট্রদর্শন সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে মানুষের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য। অর্থাৎ মানুষকে একটি নিরাপদ ও স্বাধীন পরিবেশ উপহার দেওয়াই রাষ্ট্রের অন্যতম উদ্দেশ্য।বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্র, সরকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা তথা আইন বিদ্যমান থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে রাষ্ট্র জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সুশাসন দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে সমালোচকরা মনে করেন। এর ফলেই অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা অপরাধ করেও শাস্তির আওতায় আসছে না, কিংবা এলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন হচ্ছে না।অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা কোনো সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। যখন অপরাধের বিচার দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে কিংবা কোনো কারণে অপরাধীরা শাস্তির বাইরে থেকে যায়, তখন ধীরে ধীরে সমাজে একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায়। যার প্রতিফলন দেখা যায় সাত বছর বয়সী রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবার বক্তব্যে “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার দিতে পারেন না।” এটি শুধু একজন শোকাহত বাবার আর্তনাদ নয় বরং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অনাস্থার প্রতিচ্ছবি।বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আছিয়ার ওপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনাটি উল্লেখ করা যায়। এই ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দ্রুত বিচারের বিধান থাকলেও উচ্চ আদালতের আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি দীর্ঘায়িত হয়। আছিয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখের বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হলেও ‘ডেথ রেফারেন্স’ ও আপিল শুনানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত রায় কার্যকর করা সম্ভব নয়। মামলার জটের কারণে অনেক সময় উচ্চ আদালতে একটি শুনানি শুরু হতেই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায়। অপরাধী যখন কারাগারে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় জীবনযাপন করে, তখন ভুক্তভোগী পরিবার আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর ঘুরতে থাকে। এই বৈষম্য অপরাধীদের মনে এমন বার্তা দিতে পারে যে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুধু আইনি ব্যবস্থাকেই দুর্বল করছে না, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও কারণবিচারহীনতার সংস্কৃতি বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীরা যথাযথ শাস্তির আওতায় আসে না অথবা বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিলম্বিত হয়। এর ফলে সমাজে ধীরে ধীরে এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে অপরাধ করেও শাস্তি এড়ানো সম্ভব। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোনো সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এটি আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি করে। বিচারহীনতার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, তদন্তের ত্রুটি, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার অন্যতম কারণ। এছাড়া সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা, প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা এবং আইনের অসম প্রয়োগও বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।সমাজে বিচারহীনতার প্রভাব ও নির্মম ফলাফলবিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজে নানা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। অপরাধের যথাযথ বিচার না হলে মানুষের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়। একই সঙ্গে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় হ্রাস পায়, ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। এর কারণে সমাজে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায় এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও নেতিবাচক চিন্তাভাবনা ও ভুল মূল্যবোধ গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়।যার কারণে আমরা সমাজের নানা অপরাধমূলক চিত্র দেখতে পাই। নিচের কিছু তথ্যের মাধ্যমে এর ভয়াবহতা তুলে ধরা হলো:রাজনৈতিক সহিংসতা:সারাদেশে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে অন্তত ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৩৬ জন নিহত এবং প্রায় ৪ হাজার ৭৮ জন আহত হয়েছেন।জানুয়ারিতে ১৫১টি ঘটনায় ৮ জন নিহত এবং ১,২৩৩ জন আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে সহিংসতা বেড়ে ৩৪৬টি ঘটনায় ১০ জন নিহত ও ১,৯৩৩ জন আহত হন। (সূত্র: কালের কণ্ঠ)নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ:সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ধারাবাহিক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।তাদের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে অন্তত ১,৮৯০ জন শিশু ও কিশোরী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮৩ জন নিহত এবং ১,৪০৭ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এছাড়া ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। (সূত্র: Bangla Tribune)হত্যাকাণ্ড ও অপরাধ:রাজধানীসহ সারা দেশে খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানা ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।একই সময়ে রাজধানী ঢাকায় ১০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এছাড়া এপ্রিলের প্রথম ১৫ দিনেই রাজধানীতে অন্তত ১৬টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। (সূত্র: Bangla Tribune)সমাধানের পথবিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধীরা যথাসময়ে শাস্তির আওতায় আসে। একই সঙ্গে ব্যক্তি বা অবস্থান বিবেচনা না করে সবার ক্ষেত্রে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলাও প্রয়োজন। পাশাপাশি সমাজে নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে মানুষের মধ্যে ন্যায়বোধ ও দায়িত্বশীলতা তৈরি করতে হবে।বিচারহীনতার সংস্কৃতি রোধ করা না গেলে সামাজিক অবক্ষয় আরও গভীর হবে, সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে এবং আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাবে। একপর্যায়ে এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অস্তিত্বের জন্যও বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে।মোতাহের উদ্দিন শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[sharethis-inline-buttons]

আরও পড়ুন

  • ফিচার এর আরও খবর