• ঢাকা
  • সোমবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১২ জুলাই, ২০২৬
Designed by Nagorikit.com

কুমিল্লা জার্নাল
[sharethis-inline-buttons]

জলবায়ু সংকট: বৈশ্বিক বাস্তবতা ও কূটনীতি

একদিকে ইউরোপে রেকর্ড তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভয়াবহ বন্যা। কোথাও দাবানলে পুড়ছে হাজার হাজার হেক্টর বন, কোথাও আবার সমুদ্রের লবণাক্ত পানি গ্রাস করছে মানুষের বসতি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতা আজ আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের কঠিন সত্য। আর এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর আলোচনার টেবিল এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

জলবায়ু সংকট ও এর বর্তমান চিত্র

জলবায়ু সংকট হলো মানবসৃষ্ট কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং এর ফলে আবহাওয়ার চরম অস্থিতিশীলতা ও ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টির প্রক্রিয়া。 মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন উজাড় এবং শিল্প কারখানার অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে এই সংকট ত্বরান্বিত হচ্ছে, যা প্রাণিকুল ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।জলবায়ু সংকটের কারণে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় প্রায় ১.৪৪ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮৫% মানুষ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট চরম আবহাওয়ার সম্মুখীন হচ্ছে।এই সংকট প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ।জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বৈশ্বিক গবেষণা ও তথ্য১. উষ্ণায়ন ও চরম আবহাওয়া :জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর গবেষণায় উঠে এসেছে, বিগত ১০০ বছরের তাপমাত্রাবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সারা বিশ্বে বন্যা, দাবদাহ, খরা এবং দাবানলের মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেছে ২. মানবস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব:বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতি বছর অতিরিক্ত আড়াই লাখ (২৫০,০০০) মানুষ অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং হিটস্ট্রোকের মতো সমস্যায় প্রাণ হারাবে । এছাড়া বিশ্বের প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন মানুষ অত্যন্ত জলবায়ু সংবেদনশীল এলাকায় বসবাস করছে।এছাড়াও জলবায়ু সংকট বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা,মানবিক নিরাপত্তা ও সামরিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভূরাজনীতি ও জলবায়ু কুটনীতি

ভূরাজনীতি এবং জলবায়ু কূটনীতি (Climate Diplomacy) বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি চালিকাশক্তি। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত সংকট নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক আধিপত্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছে।জলবায়ু কূটনীতি বা Climate Diplomacy বলতে আন্তর্জাতিক পরিসরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা, নীতি নির্ধারণ ও সহযোগিতার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখা,জলবায়ু অর্থায়নে (Climate Finance) উন্নত দেশগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা,উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রাখা,টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা,আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সহযোগিতা গড়ে তোলা ইত্যাদি বিষয়গুলো জলবায়ু কূটনীতির মূল লক্ষ্য হিসেবে কাজ করে থাকে। জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগজলবায়ু সংকট মোকাবেলা এবং বিশ্বে জলবায়ু সংকটের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত তদারকি ও যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে সে উদ্যোগগুলো কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

Intergovernmental panel on climate change (IPCC) IPCC হলো ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি বৈজ্ঞানিক সংস্থা, যা জলবায়ু পরিবর্তনClimate Change) বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারণে তথ্য সবরাহ করে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ, প্রভাব এবং সমাধানমূলক কৌশল নিয়ে সরকারসমূহকে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্য পরামর্শ দেয়।

Green Climate Fund (GCF):২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক তহবিল, যা জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।যার মূল উদ্দেশ্য হলোউন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সহায়তা করা, জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমনমূলক প্রকল্পে তহবিল প্রদান করা, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ১.৫° সেলসিয়াস সীমায় রাখার প্রচেষ্টায় সহায়তা করা,উন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে “climate finance gap” কমানো।

কিয়োটো প্রটোকল (Kyoto Protocol):

১৯৯২ সালে UNFCCC (United Nations Framework Convention on Climate Change) গঠিত হয়, যেখানে বলা হয় যে সকল দেশকে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ভূমিকা নিতে হবে। তবে UNFCCC ছিল শুধু নীতিগত, কোনো বাধ্যবাধকতা (binding commitment) ছিল না।সেই শূন্যতা পূরণ করতেই ১৯৯৭ সালের ১১ ডিসেম্বর জাপানে গৃহীত হয় কিয়োটো প্রটোকল। চুক্তির আনুষ্ঠানিক নাম ছিল Kyoto Protocol to the UNFCCC. জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোই এর স্বাক্ষরকারী দেশ।গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানো। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের দায়িত্বের পার্থক্য স্বীকার করা। ২০০৮-২০১২ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালের তুলনায় মোট ৫% গ্রিনহাউস গ্যাস কমানো ছিল এই প্রটোকলের মূল লক্ষ্য। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি (Paris Agreement), ২০১৫জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত COP-21 সম্মেলনে বিশ্বের ১৯৫টি দেশ প্যারিস জলবায়ু চুক্তি গ্রহণ করে। চুক্তিটি ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ গৃহীত হয় এবং ৪ নভেম্বর ২০১৬ থেকে কার্যকর হয়।এই চুক্তির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করে।প্যারিস চুক্তির প্রধান লক্ষ্য:বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে এবং সম্ভব হলে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা,Nationally Determined Contributions (NDCs)-এর মাধ্যমে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন (Adaptation) সক্ষমতা বৃদ্ধি। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা প্রদান।Common but Differentiated Responsibilities (CBDR) নীতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।

জলবায়ু সংকটে বাংলাদেশের অবস্থান

জলবায়ু সংকটে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবনাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা,খরা,ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত বাংলাদেশ। একটি ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেক্স ২০২৪ এই সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের ১২ তম সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। অন্যদিকে জার্মান ওয়াচের ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (CRI)-এর পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের শীর্ষ ১০ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় সপ্তম স্থানে।

জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান

জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কণ্ঠস্বর।যদিও বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে বাংলাদেশের অবদান ১%-এরও কম, তবুও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।বাংলাদেশ বৈশ্বিক ফোরামে জলবায়ু সুবিচার (Climate Justice), পর্যাপ্ত অর্থায়ন (Climate Finance) এবং ক্ষয়ক্ষতি পূরণের (Loss and Damage) দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করে আসছে। জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের মূল অবস্থান ও কৌশল CVF-এর নেতৃত্ব: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জোট ‘ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম’ (CVF) এবং ‘ভালনারেবল টুয়েন্টি’ (V20)-এর সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছে, যার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থ বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে。 অভিযোজন ও প্রশমন: নিজেদের খরচে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড’ (BCCTF) গঠনসহ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০, ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান (NAP) এবং মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যানের মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে।

যেভাবে হতে পারে জলবায়ু সমস্যার সমাধান

জলবায়ু সমস্যা যেহেতু একক কোন দেশের উপর প্রভাব ফেলে না বরং সমগ্র বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব বিস্তৃত। তাই জলবায়ু সমস্যা সমাধানেও স্থানীয় ও বৈশ্বিক দু’ধরনের সমাধানই প্রয়োজন। স্থানীয় (Local) সমাধানগুলো হতে পারে পরিবেশ দূষণকারী শিল্পকারখানার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন।বেশি কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পের ওপর কার্বন কর আরোপ।পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে ভর্তুকি ও উৎসাহ প্রদান।নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষরোপণ ও সবুজ অর্থনীতি (Green Economy) বাস্তবায়ন।বৈশ্বিক (Global) সমাধানগুলো হতে পারে।প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়ন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫° সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা।কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে Net Zero Emissions অর্জন। সৌর ও বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার।বন উজাড় রোধ ও ব্যাপক বনায়ন।উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন (Climate Finance) ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা।

জলবায়ু সংকট কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি যৌথ চ্যালেঞ্জ। তাই এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর বৈশ্বিক কূটনীতি এবং সমন্বিত উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ পেলে এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়ে এলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।

মোতাহের উদ্দিন শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[sharethis-inline-buttons]

আরও পড়ুন

  • ফিচার এর আরও খবর