• ঢাকা
  • সোমবার, ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২৭ জুলাই, ২০২৬
Designed by Nagorikit.com

বাজারের অধিকাংশ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, এখন করণীয় কী?

কুমিল্লা জার্নাল
[sharethis-inline-buttons]

রাজধানীর লালবাগের খাজা দেওয়ান সেকেন্ড লেনের বাসিন্দা গৃহবধূ সুলতানা রহমান। দুই সন্তানের মা তিনি। রোববার (২৬ জুলাই) দুপুরে খাবার শেষে বিছানায় শুয়ে টেলিভিশনের চ্যানেল স্ক্রল করছিলেন।এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখেন- দেশে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এমনকি শিশুদের জন্য বাজারজাত ছয়টি টুথপেস্টের চারটিতেও মিলেছে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।

খবরটি দেখার পর থেকেই উদ্বেগ বাড়তে থাকে সুলতানার। কারণ, তার ছোট দুই সন্তান দাঁত ব্রাশ করার সময় প্রায়ই টুথপেস্ট গিলে ফেলে।

সন্ধ্যার পর থেকে তিনি পরিচিতজনদের কাছে প্রশ্ন করছেন যে এতে শিশুদের শরীরের কতটা ক্ষতি হতে পারে, এতদিন কতটা ক্ষতি হয়েছে, বিকল্প কী আছে ?

এসব প্রশ্ন শুধু সুলতানা রহমানের একার নয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মনেও এখন একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।রোববার এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল প্রকাশ করে। এতে উঠে এসেছে, দেশে পাওয়া যাওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে (৭৬.৫%) রয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে।

এ তথ্য প্রকাশের পর থেকে উদ্বিগ্ন সব শ্রেণির ভোক্তা। প্রতিদিন সকালে ও রাতে যে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজছেন সেটিই যদি প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা বহন করে তাহলে তা কি শরীরে প্রবেশ করছে? এর ফলে কোন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে? এখন কি টুথপেস্ট পরিবর্তন করা উচিত নাকি দাঁত ব্রাশ করাই বন্ধ করে দিতে হবে!এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে জাগো নিউজ কথা বলেছে জনস্বাস্থ্য ও দন্তচিকিৎসা সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই গবেষণা প্রতিবেদনটি বিস্তারিত না দেখে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।তাদের ভাষ্য, পুরো গবেষণা পর্যালোচনা করে তবেই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত দেওয়া সম্ভব।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গবেষণার ফল প্রকাশের পরই টুথপেস্ট ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।আরও গবেষণা প্রয়োজন এ বিষয়ে রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে গবেষণাটি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।তবে তিনি বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু প্রসাধনী সামগ্রী নয়, পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহারের কারণেও মাছ, মাংস ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।।

এরই মধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা ও অন্যান্য টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন খাদ্যেও এর উপস্থিতি মিলছে। সে বিবেচনায় শুধু টুথপেস্ট নয়, দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেও মানুষের মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি রয়েছে।ডা. মুশতাক হোসেনের ব্যক্তিগত অভিমত, প্রাপ্তবয়স্করা সাধারণত ব্রাশ করার পর ভালোভাবে কুলি করেন। ফলে টুথপেস্টের মাধ্যমে তাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হতে পারে।

অনেক শিশু ব্রাশ করার সময় টুথপেস্ট গিলে ফেলে। এতে দীর্ঘমেয়াদে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপর কোনো প্রভাব পড়তে পারে কি না তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।-জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন তবে শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বলে মনে করেন তিনি। এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, অনেক শিশু ব্রাশ করার সময় টুথপেস্ট গিলে ফেলে। এতে দীর্ঘমেয়াদে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপর কোনো প্রভাব পড়তে পারে কি না তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

তবে তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন, এসডোর গবেষণা প্রতিবেদনটি না দেখে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট মন্তব্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।‘ব্রাশ বন্ধ নয়, আরও গবেষণা দরকার’দন্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁতের সুরক্ষার জন্য নিয়মিত ব্রাশ করা অপরিহার্য। তবে টুথপেস্টে ব্যবহৃত উপাদান সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা জরুরি।

তাদের মতে, ব্রাশ করার সময় অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট অনেকেই অজান্তে গিলে ফেলেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা আরও বেশি। এছাড়া ব্যবহারের পর টুথপেস্টের সঙ্গে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্জ্য পানির মাধ্যমে পরিবেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

টুথপেস্টের মূল কাজ দাঁত পরিষ্কার রাখা এবং ফ্লোরাইডের মাধ্যমে দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধ করা। তাই একটি গবেষণার ভিত্তিতে দাঁত ব্রাশ বন্ধ করার কোনো যৌক্তিকতা নেইবিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বিভিন্ন গবেষণায় শনাক্ত হলেও শুধু টুথপেস্টের মাধ্যমে এর স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা সে বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দন্ত বিশেষজ্ঞ বলেন, টুথপেস্টের মূল কাজ দাঁত পরিষ্কার রাখা এবং ফ্লোরাইডের মাধ্যমে দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধ করা। তাই একটি গবেষণার ভিত্তিতে দাঁত ব্রাশ বন্ধ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।‘মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা মানবদেহের জন্য উদ্বেগের’বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডেন্টাল অনুষদের ডিন ও ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্তের কাছে জানতে চাইলে তিনিও তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।গবেষণা প্রতিবেদনটি না দেখে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা মানবদেহ ও পরিবেশ-উভয়ের জন্যই উদ্বেগের বিষয়। এর প্রকৃত স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।-ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত তিনি বলেন, গবেষণা প্রতিবেদনটি না দেখে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা মানবদেহ ও পরিবেশ-উভয়ের জন্যই উদ্বেগের বিষয়। এর প্রকৃত স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় এলেও এর সঙ্গে ব্যয়সংক্রান্ত বিষয়ও জড়িত বলে জানান তিনি।ডা. সাখাওয়াত সায়ন্ত জনস্বার্থ ও শিল্পখাতের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রেখে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে গবেষকদের আরও স্পষ্ট ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের পরামর্শ দেন।নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক দন্ত বিশেষজ্ঞ বলেন, গবেষণা প্রতিবেদনটি সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা উচিত। পাশাপাশি এর পেছনে কোনো বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, গবেষণার তালিকায় এমন একটি টুথপেস্ট রয়েছে, যা মালয়েশিয়া, ভুটান ও নেপালে রপ্তানি করা হয়। ফলে বিষয়টি বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এখন সময়ের দাবি।

[sharethis-inline-buttons]

আরও পড়ুন

  • লিড এর আরও খবর