গেল ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বড় ধরনের ধস নামে। বিদায়ি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৬৭.৫২ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এডিপি বাস্তবায়নে অদক্ষতায় নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্য খাত। ৩ হাজার ১২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯৭৪ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে অদক্ষতায় অলস পড়ে আছে ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। এছাড়া বাস্তবায়নে ৪০ শতাংশের নিচে রয়েছে সরকারের ৮ প্রতিষ্ঠান। বৃহস্পতিবার বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিপি বাস্তবায়নের এমন নিম্নহার সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন না হলে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, জ্বালানি, পরিবহণ ও স্থানীয় সরকার খাতের উন্নয়ন কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়তে থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা (সংশোধিত) বরাদ্দের বিপরীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে। সরকারি তথ্যই বলছে, এটি গত ৫০ বছরে উন্নয়ন কর্মসূচির দুর্বলতম বাস্তবায়ন। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরের পর এবারই মোট বরাদ্দের পরিমাণ সবচেয়ে কম ছিল।এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের উন্নয়ন ব্যয় ছিল সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বরাদ্দের ৬৮ শতাংশ। তাতে দেখা গেছে, কয়েক বছর ধরেই এডিপি বাস্তবায়নের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ হার ছিল ৯২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাস্তবায়ন হয় ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও কমে গিয়ে তা ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি টানা পাঁচ বছর নিম্নমুখী।আইএমইডির তথ্যমতে, অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ব্যয় হয়েছে ৪০ হাজার ৩০৮ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা সংশোধিত এডিপির ১৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই মাসে ব্যয় হয়েছিল ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি ১০ লাখ টাকা বা ১৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের শেষদিকে ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা থাকলেও আগের বছরের তুলনায় তা কম ছিল। আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে ৪০ শতাংশের নিচে বাস্তবায়ন হয়েছে-সরকারের এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮টি। সবচেয়ে কম ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে সংসদবিষয়ক সচিবালয়, যা গত এক বছরে ব্যয় করেছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। বরাদ্দ ছিল ২০ লাখ টাকা।
এর পরে রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাস্তবায়নের হার ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ৬৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের বাস্তবায়নের হার ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। বরাদ্দ ৫৯৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১০৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বাস্তবায়ন হার ২৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। ৫৫৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১৬৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।এডিপিতে শিক্ষা খাতে মোটামুটি অবস্থান দখল করলেও নাজুক পরিস্থিতে রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্য খাত। গত এক বছরে বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ১২৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯৭৪ কোটি টাকা। অদক্ষতায় অলস পড়ে আছে ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন হার ৩২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের বাস্তবায়ন যথাক্রমে ৩২ দশমিক ৪৫ এবং ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ।আইএমইডির কর্মকর্তারা জানান, বিগত যে কোনো অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশের ওপরে থাকত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রশাসনে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। ওই সময় অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ও ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে যান। এ কারণে সে বছর এডিপি বাস্তবায়ন কম ছিল।অন্যদিকে, সদ্য বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও একই ধরনের প্রশাসনিক অস্থিরতার প্রভাব বজায় ছিল। পাশাপাশি নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা কার্যক্রমের কারণে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পে পর্যাপ্ত মনোযোগ ছিল না। এ কারণে গেল অর্থবছরে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে।
[sharethis-inline-buttons]
আপনার মতামত লিখুন :