• ঢাকা
  • বুধবার, ১২ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০ আগস্ট, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১০ আগস্ট, ২০২৬
Designed by Nagorikit.com

তদন্ত কমিটি গিলে খাচ্ছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রশাসন

কুমিল্লা জার্নাল
[sharethis-inline-buttons]

কলেজ প্রতিনিধি :

ঘটনা ঘটে। গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। এরপর উধাও হয়ে সেই কমিটি ও তাদের প্রতিবেদন। তদন্তের অগ্রগতি কী, প্রতিবেদন কোথায়, সুপারিশ কী জানতে পারেন না ভুক্তভোগীরাও।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে একের পর এক ঘটনায় এমন তদন্ত কমিটি গঠনের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ঘটনার তদন্ত এক-দুই বছর নয়, বরং বছরের পর বছর পার হলেও ভুক্তভোগীর পরিবারসহ কেউই আজও জানেন না কি ছিলো সেই প্রতিবেদন।

এমনকি তদন্তের বিষয়ে জানতে গেলেও

ভুক্তভোগীদের নানা অজুহাতে ঘোরানো হয় বলে অভিযোগ। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এসব তদন্ত কমিটি কি সত্যিই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য, নাকি প্রশাসনের দায় এড়ানোর জন্য সাময়িক কৌশলগত পদক্ষেপ?তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ না করলেও দাবি করছে, কোনো কোনো তদন্তের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

কিছু বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মতো সংস্থাকেও জানানো হয়েছে।

তামিমকে নির্যাতন, দুই বছরেও অজানা তদন্তের ফল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থান আন্দোলন চলাকালে ১২ জুলাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিলের ছবি তোলার অভিযোগে মিছিল শেষে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কলেজ শিক্ষার্থী মো. তামিম হোসেনকে কাজী নজরুল ইসলাম হলের টর্চার সেলে নিয়ে বেদম প্রহার ও যখম করার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর কলেজ প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্তের ফল কী তা আজও জানতে পারেননি তামিম ও তার পরিবার।

এ বিষয়ে কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল বাশার ভূঁঞা বলেন, “তামিমের তদন্ত প্রতিবেদন আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

নয় বছরেও প্রকাশ হয়নি ফয়জুন্নেছা হলের তদন্ত

২০১৬ সালের ২৭ জুলাই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের নওয়াব ফয়জুন্নেছা হল থেকে তিন ছাত্রীকে জঙ্গি সন্দেহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে। ঘটনাটি নিয়ে তখন কলেজ প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু ঘটনার প্রায় নয় বছর পরও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সাবেক শিক্ষার্থীদের। দীর্ঘদিন ধরে তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলেও তাঁরা কলেজ প্রশাসনের কাছ থেকে সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাননি বলে জানান।

ভুক্তভোগী সাবেক শিক্ষার্থী কানিজ ফারহানা বাতুল বলেন, “ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রশাসনের তদন্ত কমিটি কি আজীবন তদন্ত কমিটি? ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালে মামলা থেকে খালাস পাওয়ার আগে অনেকবার তদন্তের বিষয়ে জানতে গিয়েছি। বারবার কলেজ অধ্যক্ষ আমাকে ঘুরিয়েছেন। আমাদের সঙ্গে এত কিছু ঘটলেও তিনি একটুও সহমর্মিতা দেখাননি।

তিনি বলেছিলেন, হাজিরা আসবে, হাজিরা যাবে, তদন্ত প্রতিবেদন জানানো হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত জানানো হয়নি।”

এ বিষয়ে কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল বাশার ভূঁঞা বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আটক তিন শিক্ষার্থীর জঙ্গিবাদে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তাদের কাছ থেকে যেসব বই পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো সাধারণ লাইব্রেরিতেও পাওয়া যায়। জাকির নায়েকের বই পাওয়া গিয়েছিল। তবে জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদী কোনো কিছু তদন্ত কমিটি পায়নি।

কয়েক হাজার ভুয়া বিল-ভাউচার, তদন্ত কোথায়?

২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রশাসনিক ভবনসহ বিভিন্ন বিভাগ থেকে ২৮টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ৪০ হাজার ভুয়া বিল-ভাউচার উদ্ধার করে তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়রা। বিষয়টি নিয়ে কলেজ প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। এরপর প্রায় দুই বছর হতে চললেও সেই তদন্তের অগ্রগতি কিংবা প্রতিবেদন সম্পর্কে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।

কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল বাশার ভূঁঞা বলেন, ভুয়া বিল-ভাউচারের বিষয়টি নিয়ে দুদকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা তদন্ত করবে। তবে কলেজ প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পতাকার খুঁটিতে জুতা, তদন্তের ফলও অজানা কলেজের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের খুঁটিতে দুর্বৃত্তরা জুতা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাতেও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই তদন্তের প্রতিবেদন জমা হয়েছে কি না, কিংবা ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এ বিষয়ে কলেজ অধ্যক্ষ বলেন, পতাকা উত্তোলনের খুঁটিতে জুতা আটকে দেওয়ার বিষয়টি সে সময় তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছিল। ‘তদন্ত শেষ না হলে ক্যাম্পাস নিরাপদ কীভাবে?’ তদন্ত কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও।

গণিত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর হোসেন বলেন, “আমি ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ি। তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে এমন ছলচাতুরী হলে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত হবো এটাই স্বাভাবিক। কলেজ প্রশাসন কি ইচ্ছা করেই এসব তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো শক্তি কাজ করছে? নাকি সাময়িক দায় এড়ানোর কৌশল তা বুঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।”

বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মহামুদা আক্তার মিলা বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ যদি কোনো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার করতে না পারে, তাহলে এই ক্যাম্পাস নিরাপদ নয়। সব শিক্ষার্থীই নিরাপত্তাঝুঁকিতে থাকবে ও তদন্ত প্রতিবেদন নামের কমিটি গুরুত্ব হারাবে। আমি চাই, কলেজ প্রশাসন সঠিক প্রতিবেদন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।

‘বিষয়গুলো দেখে জানাব’ এ বিষয়ে কলেজ শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক গাজী গোলাম মোহাম্মদ সোহরাব হাসানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়গুলো আমাকে আরেকটু দেখতে হবে। আমি তো নতুন সম্পাদক হয়েছি। বিষয়গুলো জেনে পরে জানাব।যদিও তিনি গতবছরের ৯ ডিসেম্বর থেকে শিক্ষক পরিষদ সম্পাদকরের দায়িত্ব পালন করছেন। তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে তিনি কিছুই জানাতে পারেননি।

একাধিক ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন, দীর্ঘদিনেও প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া এবং ভুক্তভোগীদের তদন্তের ফল জানাতে অনীহার অভিযোগে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের উধাও হয়ে যায়।

[sharethis-inline-buttons]

আরও পড়ুন

  • লিড এর আরও খবর