• ঢাকা
  • সোমবার, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫
Designed by Nagorikit.com

রাজনীতিতে এমপি পদের মর্যাদা: দায়িত্বের সংকট ও যোগ্যতার প্রশ্ন

কুমিল্লা জার্নাল
[sharethis-inline-buttons]


একটি সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ সদস্য (এমপি) পদটি রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতায় এ পদটির মর্যাদা, দায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। এমপি কারা হবেন, কী যোগ্যতায় হবেন এবং জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা কী—এই মৌলিক বিষয়গুলো ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, রাজনীতিতে এমপি ও মন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক জ্ঞান, রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা কিংবা নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য, আবেগ ও তথাকথিত ত্যাগের বয়ান বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে এমন অনেক ব্যক্তি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসছেন, যাদের প্রস্তুতি ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এমপি পদকে অনেক সময় একটি বিনিয়োগমূলক অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনে বিপুল ব্যয়ের পর পাঁচ বছরে তা পুষিয়ে নেওয়ার মানসিকতা জনপ্রতিনিধিত্বের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে করে জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার পরিবর্তে এমপি হয়ে ওঠেন ক্ষমতা ও সুবিধাভোগের কেন্দ্রবিন্দু।
সংবিধান অনুযায়ী এমপি একজন আইনপ্রণেতা। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অনেক এমপি সংবিধানের মৌলিক অনুচ্ছেদ, রাষ্ট্রীয় কাঠামো কিংবা নিজের সাংবিধানিক সীমা ও কর্তব্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন না। আইন প্রণয়নের দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের কাছেই যদি আইন ও সংবিধান পাঠ অগ্রাধিকার না পায়—তবে তা রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত।
রাজনীতিতে ত্যাগের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মামলা, নির্যাতন, এলাকা বা দেশ ছাড়ার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। কিন্তু কেবল ত্যাগই যদি নেতৃত্বের একমাত্র মানদণ্ড হয়, তাহলে সেই বিচারে অসংখ্য কর্মী ও সমর্থকও সমানভাবে দাবি তুলতে পারেন। নেতৃত্ব নির্বাচন যদি এই পর্যায়ে এসে আবেগনির্ভর হয়ে পড়ে, তবে যোগ্যতা ও সক্ষমতা উপেক্ষিত হয়।
এখানেই আরেকটি বৈপরীত্য স্পষ্ট—অনেক ত্যাগী, অভিজ্ঞ ও যোগ্য নেতা বছরের পর বছর দলের জন্য কাজ করেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে দূরে থাকেন, আর অপেক্ষাকৃত কম প্রস্তুত ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। এতে শুধু নেতৃত্বের মান প্রশ্নবিদ্ধ হয় না, বরং দল ও রাষ্ট্র—উভয়ের ভেতরেই হতাশা ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তি বা ঘটনার মূল্যায়নে অতিরিক্ত আবেগ ও অযৌক্তিক তুলনার প্রবণতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ইতিহাস, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের মান নির্ধারণে ভারসাম্য না থাকলে জাতির বোধ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো আবেগনির্ভর অনুশীলন নয়। একটি কার্যকর ও দায়বদ্ধ গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন—এমপি ও মন্ত্রী নির্বাচনে স্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড, সাংবিধানিক দায়িত্ব সম্পর্কে সুগভীর জ্ঞান এবং ব্যক্তিগত আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা।
নচেৎ এমপি পদটি কেবল ক্ষমতার প্রতীক হিসেবেই থেকে যাবে, প্রতিনিধিত্বের মূল দর্শন ক্রমেই হারিয়ে যাবে।

লেখক: নয়ন বাঙ্গালি

রাজনীতি স্কুলের মাস্টার

[sharethis-inline-buttons]

আরও পড়ুন

  • জাতীয় এর আরও খবর