• ঢাকা
  • শনিবার, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫ জুন, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ৫ জুন, ২০২৬
Designed by Nagorikit.com

এস আলমের ব্যাংক লুটের পরামর্শক ছিলেন ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ

কুমিল্লা জার্নাল
[sharethis-inline-buttons]

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতাপশালী কর্মকর্তা হয়ে উঠেছিলেন মো. খুরশীদ আলম। এই কর্মকর্তাকে নিজ বিভাগের মানুষ হিসেবে ব্যাংক লুটের বিশ্বস্ত সহচর হিসেবেই লুফে নেন চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম (এস আলম)। বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে নানা অনিয়মের পথ বের করে সেই অনুযায়ী এস আলমকে চলার পরামর্শ দিতেন তিনি। এমনকি ব্যাংক ঋণ বাগিয়ে নিতে সকল কূটকৌশলও বাতলে দিতেন।

বাইরে থাকা সব কর্মকর্তা ছিলেন কোণঠাসা। এই খুরশীদ আলম সিন্ডিকেট বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিস এবং টার্গেটেড বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অঘোষিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করত।মূলত এস আলমের ক্ষমতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতার মধ্যে এক সেতুবন্ধন রচনা করেছিলেন এই খুরশীদ আলম। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খুরশীদ আলম ডেপুটি গভর্নর হন। তবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এস আলমের ব্যাংক লুটের সহচর এবং পরামর্শক থাকার দায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে তিনি ডেপুটি গভর্নর হিসেবে পদচ্যুত হন। তবে এই কর্মকর্তা যে নতুন করে অনিয়ম করেছেন তা নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসে চাকরিকালে অনিয়মের দায়ে শাস্তি হিসেবে তার ইনক্রিমেন্ট স্থগিত ছিল।বাংলাদেশ ব্যাংক গত মঙ্গলবার জানায়, খুরশীদ আলমের স্ত্রী আফরোজা আক্তার ২০১৬ সালে এস আলমের মালিকানাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা ঋণ নেন। ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন স্বয়ং এস আলম। তিনি খুরশীদ আলমের স্ত্রী আফরোজা আক্তারকে এই টাকা দেন সম্পূর্ণ ভুয়া ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে। যে ঋণ আজও শোধ করেননি আফরোজা আক্তার, যা সিআইবি প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।গত ২৪ মে খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তার নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন ব্যাংকটির গ্রাহকরা। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও এসআইবিএলের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এস আলমের ব্যাংক লুটপাটের পরামর্শক হিসেবে খুরশীদ আলমের ভূমিকা এবং তার প্রতিদান হিসেবে খুরশীদ আলমের স্ত্রীকে উপহার হিসেবে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।এস আলম-খুরশীদ আলম ঘনিষ্ঠতা২০১৬ সালে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম। তখন থেকেই খুরশীদ আলমের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে তার। খুরশীদ আলম তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক (বর্তমান পরিচালক সমমান পদ)। ঘনিষ্ঠতার সূত্রে এস আলমকে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে লুটপাটের কলাকৌশল বাতলে দিতেন তিনি।খুরশীদ আলমের বাড়ি চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায়। এস আলম স্বভাবজাতভাবেই চট্টগ্রামের পটিয়া তথা পুরো বিভাগের মানুষকে বাড়তি গুরুত্ব দেন। ইসলামী ব্যাংক দখলে নেওয়ার পর কোনো পরীক্ষা ছাড়াই প্রায় ৯ হাজার লোক নিয়োগ দেন তিনি। এই লোক নিয়োগেও খুরশীদ আলম পরামর্শ দিয়েছিলেন।খুরশীদ আলমকে এস আলমের পুরস্কারঅনিয়মে সহযোগিতার প্রতিদান হিসেবে খুরশীদ আলমের স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সাড়ে তিন কোটি টাকার ঋণ উপহারের ব্যবস্থা করেন এস আলম। এ জন্য খুরশীদ আলমের স্ত্রী আফরোজা আক্তার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক জামাল মোল্লার স্ত্রী আলেয়া খানম চৌধুরীর নামে একটি ভুয়া কোম্পানি খোলা হয়। এই কোম্পানিতে তাদের শেয়ার যথাক্রমে ১৬ শতাংশ ও ২৬ শতাংশ। আলেয়া খানম চৌধুরী কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ও আফরোজা আক্তার পরিচালক। এ ছাড়া কোম্পানিটিতে আরও তিনজন পরিচালক রয়েছেন, যারা তাদেরই আত্মীয়-স্বজন বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ‘এগ্রোক্রপ লিমিটেড’ নামের ওই কোম্পানির ঠিকানা দেখানো হয় ধানমন্ডিতে। তবে ধানমন্ডির ওই ঠিকানায় এগ্রোক্রপ লিমিটেড নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই।

এখন বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংক থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বের করে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে তার সম্পদ জব্দ হওয়া শুরু হয়েছে। এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পদত্যাগ করতে হয় খুরশীদ আলমকে। আর জামাল মোল্লাকে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন খুরশীদ আলমকে আবার ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের থেকে জানা যায়, এস আলমের কাছে যখন কেউ ঘুষ দাবি করত, তখন তিনি তাদের ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দিতেন। এ জন্য ব্যাংকগুলো তাদের নামে কোম্পানি তৈরি করে ঋণ সৃষ্টি করত। এ ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ মালিক খুরশীদ আলমের স্ত্রী। ওই ঋণ পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়েছে। ফলে খুরশীদ আলমকে ঋণখেলাপি হিসেবে অভিহিত করা সঠিক নয়। তার স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলেও খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি নন।খুরশীদ আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে পরে এমবিএ করেন। ১৯৮৮ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যোগ দেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হওয়ার আগে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ, কৃষি ঋণ বিভাগ, পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট, ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট, ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশন, এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট, সচিব বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুরে। এক মেয়ে ও এক ছেলের বাবা তিনি।

সাইফুল আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় সাইফুল আলমের পাশাপাশি আছেন তার ছেলে আহসানুল আলম এবং জামাতা বেলাল আহমেদ। এ ছাড়া সাইফুল আলমের একাধিক ভাই এবং তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও এসব কোম্পানির মালিকানায় রয়েছেন। ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের নামে। বর্তমানে ব্যাংকটিতে এ প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণেও শীর্ষে।২০১৭ সালে ব্যাংকের শেয়ার কেনার সময় এই কোম্পানি থেকেও অর্থ গেছে। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। এরপর এস আলম রিফাইন্ড সুগারের খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ১০ হাজার ১১৩ কোটি, সোনালী ট্রেডার্সের ৪ হাজার ৮৫৩ কোটি এবং এস আলমের মা চেমন আরার নামে করা কোম্পানি চেমন ইস্পাতের খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের তিনটি থেকেই শেয়ার ক্রয়ের সময় অর্থ গিয়েছে।এ ছাড়া শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের মধ্যে আরও রয়েছে আহসানুল আলমের মালিকানাধীন ইনফিনিয়া সিআর স্ট্রিপস, যার খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলসের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলী ফুডসের ১ হাজার ৭৮৩ কোটি এবং ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্সের ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা, যেটি এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের আত্মীয় আনসারুল আলম চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র মো. আবুল কালাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, ব্যাংকে কোন গ্রুপের কত শেয়ার ধারণ রয়েছে তার তদারকি করা মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। বিএসইসির প্রধান কাজ হলো বড় অঙ্কের শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ তথ্য প্রকাশ বা ডিসক্লোজার নিশ্চিত করা। তিনি আরও বলেন, কোনো কোম্পানির বিনিয়োগের অর্থের উৎস বা মানিলন্ডারিং-সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব বিএফআইইউর। সিকিউরিটিজ আইনের সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে বিএসইসি অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।সর্বশেষ বিএফআইইউ জানায়, এস আলম ৯টি দেশে অর্থ পাচার করেছে। তার মধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র সাইপ্রাসে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি ক্রোক করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। সাইপ্রাসের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিটের ‘মোকাস’-এর আবেদনের পর গত ১৯ মে এই সম্পত্তি ক্রোকের আনুষ্ঠানিক আদেশ আসে। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি ইউরোর বেশি অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত লিমাসসোল জেলার পারেকলিসিয়ায় অবস্থিত এস আলমের এই সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেয় বলে জানা গেছে।

সূত্র: এশিয়া পোস্ট

[sharethis-inline-buttons]

আরও পড়ুন

  • লিড এর আরও খবর