• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৮শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২৮ মে, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২৮ মে, ২০২৬
Designed by Nagorikit.com

কুবির ২০ বছরের পথচলায় কিছু অপ্রকাশিত গল্প

কুমিল্লা জার্নাল
[sharethis-inline-buttons]

শালবন বিহারের কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো শিক্ষার্থীর অভয়ারণ্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) আজ বিশটি বসন্ত পেরিয়ে পা রাখল একুশতম বছরে। দুই দশকের এই দীর্ঘ পথচলায় কুবির আকাশ দেখেছে হাজারো তরুণের স্বপ্ন ছোঁয়ার গল্প। অগণিত মাইলফলক আর লক্ষ্য ছোঁয়ার আলো-ঝলমলে এই উদ্‌যাপনের আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু অপ্রকাশিত গল্প, সম্পূর্ণ এক অচেনা জগতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার নীরব সংগ্রামের গল্প।

প্রতি বছর যখন নতুন একঝাঁক শিক্ষার্থী যখন এই ক্যাম্পাসে পা রাখে, তখন উৎসবের আবহ ছাপিয়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় কিছু রূঢ় বাস্তবতা, কিছু মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল। ​কুবির একুশ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় শিক্ষার্থীদের মানিয়ে নেওয়ার সেই চিরন্তন অথচ আড়ালে থাকা অভিজ্ঞতাগুলো বারবার মনে করিয়ে দেয়, নতুন আঙিনায় খাপ খাইয়ে নেওয়াটা মোটেও সহজ নয়।

​​বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যানভাসে এসে প্রথমে যে ধাক্কাটি অনেককে স্তব্ধ করে দেয়, তা বাইরের পরিবেশ নয়, বরং নিজের ভেতরের এক অদ্ভুত শূন্যতা। স্কুল-কলেজে যেখানে নিজের একটা নির্দিষ্ট পরিচয় থাকে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো মানুষের ভিড়ে নিজেকে বড়ো বেশি একা আর সাধারণ মনে হতে থাকে।

শুনব কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর কথা। যেভাবে প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে ভালোবাসায় মুড়িয়ে নিয়েছে বর্তমান ঠিকানাকে।

​কুবির অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো: শাহরিয়ার সৌরভ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল হলো পরিচয় সংকট। অসংখ্য প্রতিভার মাঝে নিজেকে তুলনা করতে গিয়ে অনেকেই তীব্র অনিশ্চয়তায় ভোগেন। নিজের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে ‘আমি আসলে কে? কি চাই?’ নিজেকে প্রমাণ করার এই মানসিক চাপ আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিনগুলোকে কঠিন করে তোলে।”

​​মানসিক এই টানাপোড়েনের পাশাপাশি চলে চেনা পরিবেশ আর চেনা মানুষদের ছেড়ে আসার কষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ধাপটাই হলো ঘরছাড়া হওয়ার এক নতুন অধ্যায়। মায়ের হাতের মমতা আর চেনা ঘরের উষ্ণতা ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন এক পরিবেশে এসে বুক ধড়ফড়ানির সেই অনুভূতি কাটিয়ে ওঠা বেশ কঠিনই।

​মার্কেটিং বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাবিবা আফরোজ নিহা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ায় নতুন পরিবেশ। চিরচেনা মুখ, পরিচিত বাতাস ছেড়ে যখন নতুন জায়গায় আসি তখন সবকিছুই অপরিচিত লাগে। তবে সেই অপরিচিত, অদ্ভুত অনুভূতিগুলো পার করে যখন ক্লাস শুরু হয়, বন্ধুদের আড্ডা জমে, তখন ঘরছাড়ার সেই তীব্র কষ্টটাও ফিকে হয়ে আসে।”

মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবেশগত এই দেয়ালগুলো একসময় শিক্ষার্থীরা অতিক্রম করতে পারলেও প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াইয়ে আরেকটি বড়ো সংকট হয়ে ওঠে খাবারের সমস্যা।

​পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, “সময়ের সঙ্গে অনেককিছু মানিয়ে নেয়া গেলেও এখানকার খাবার ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো বেশ কঠিন। ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়ায় ভালো দামে মানসম্মত খাবার পাওয়া যায় না, আবার ক্যাম্পাসের আশেপাশে মানসম্মত খাবারের দোকানও কম, তাই খাবারের বৈচিত্র্য খুব সীমিত।”

পরিবেশ ও খাবারের লড়াইয়ের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বদলে যাওয়া শিক্ষাপদ্ধতি এবং একাকীত্বও অনেক শিক্ষার্থীর জন্য বড়ো এক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। স্কুল-কলেজের নির্ধারিত রুটিনের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার বিস্তৃত জগতে এসে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সমীকরণ অনেকের কাছেই জটিল হয়ে ওঠে।

​গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফাউজিয়া ফারিহা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুটা ছিল পরিবার ও পুরোনো বন্ধুদের চেনা সান্নিধ্য হারিয়ে এক অচেনা গোলকধাঁধায় পড়ার মতো। নতুন বন্ধু তৈরি করা, সবার সাথে সহজে মিশে নিজের জায়গা তৈরি করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন আর জটিল সময় ব্যবস্থাপনার গোলকধাঁধা বেশ মানসিক চাপে ফেলে।’

​পরিচয় সংকটের দোলাচল, ঘরছাড়ার নীরব কষ্ট, খাবারের সীমাবদ্ধতা কিংবা অ্যাকাডেমিক চাপ কুবির একুশ বছরের ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি এর প্রতিটি বাঁকে ছড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের অসংখ্য না বলা এমন সংগ্রামের গল্প। তবে এই চড়াই-উতরাই পেরিয়েই একসময় শিক্ষার্থীরা ভালোবেসে ফেলে লাল মাটির এই ক্যাম্পাসকে, আপন করে নেয় কুবির প্রতিটি কোণ।

[sharethis-inline-buttons]

আরও পড়ুন

  • ক্যাম্পাস এর আরও খবর